হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.) বলেন, অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে তাঁদের সন্তান সামান্য কথাতেই মন খারাপ করে বা কষ্ট পায়। অথচ এটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ, যে শিশু অন্যায় বা অমার্জিত আচরণে কষ্ট অনুভব করে, তার বিবেক ও মানবিক সংবেদনশীলতা এখনও জীবিত রয়েছে। বিপরীতে, যদি সে সবকিছুর প্রতি নির্বিকার হয়ে যায়, তবে সেটিই চিন্তার বিষয়।
আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজি প্রশ্ন তোলেন, “একটি শিশুকে যদি বারবার অপমান করা হয়, অবহেলা করা হয়, অথচ সে কিছুই অনুভব না করে—এটি কি ভালো লক্ষণ? বরং এটি তার অনুভূতিশক্তি ও উপলব্ধিবোধের দুর্বলতারই প্রমাণ।”
সংবেদনশীলতা কীভাবে হারিয়ে যায়
তিনি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। গরম কোনো বস্তু প্রথমবার স্পর্শ করলে হাত পুড়ে যায় বা ফোসকা পড়ে। কিন্তু একই অভিজ্ঞতা বারবার ঘটতে থাকলে ত্বকে একটি শক্ত আবরণ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে সেই সংবেদনশীলতা কমে যায়। তখন আগের মতো উত্তাপ আর অনুভূত হয় না।
মানসিক ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। অপমান, গালি বা রূঢ় আচরণ বারবার সহ্য করতে করতে মানুষ একসময় সেগুলোর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে যে আচরণ একসময় গভীর কষ্ট দিত, তা আর তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।
অপমানকে যেন স্বাভাবিক মনে না করে
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক সময় অভিভাবকেরা সন্তানকে এত বেশি বকাঝকা করেন যে শিশুটি মনে করতে শুরু করে—প্রতিদিন কিছু তিরস্কার বা অপমান শোনা যেন তার স্বাভাবিক প্রাপ্য। এমনকি এমন অবস্থাও তৈরি হতে পারে যে, কঠোর ভাষা ব্যবহার না করলে সে কোনো নির্দেশনাকেই গুরুত্ব দেয় না।
এ ধরনের পরিবেশ শিশুর মনে ভুল ধারণা জন্ম দেয় যে, শাসন, শিক্ষা কিংবা সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো অপমান ও রূঢ়তা। দীর্ঘমেয়াদে এটি তার আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলুন
আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে সে না অপমানের ভয় দ্বারা পরিচালিত হয়, না অতিরিক্ত প্রশংসা বা অনুনয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বরং সে যেন নিজের বিবেক, বিচারবোধ এবং দায়িত্ববোধের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে।
তিনি বলেন, সন্তানকে উপদেশ দিন, ভুল ধরিয়ে দিন, কিন্তু তাকে এমনভাবে অভ্যস্ত করবেন না যে সে সবসময় বাইরের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকে। প্রকৃত শিক্ষা হলো তার ভেতরের নৈতিক শক্তি ও বিবেককে জাগিয়ে তোলা।
তাঁর ভাষায়, যেমন একজন মা সন্তানের প্রতি মমতা থেকে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারেন, তেমনি আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষের অন্তরেও একটি অন্তর্নিহিত পথপ্রদর্শক শক্তি দান করেছেন। সেই বিবেক ও নৈতিক চেতনা যদি সঠিকভাবে লালিত-পালিত হয়, তবে তা মানুষকে নিজেই ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে, ভুল থেকে ফিরে আসতে এবং সৎপথে চলতে সহায়তা করবে।
সূত্র: রাহে রুশদ (বিকাশের পথ), প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৬।
আপনার কমেন্ট